| বঙ্গাব্দ

সিরিয়ার কুনেইত্রায় ইসরাইলি ট্যাংকের অনুপ্রবেশ, বাড়ি বাড়ি তল্লাশি | ২০২৬

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 16-05-2026 ইং
  • 43179 বার পঠিত
সিরিয়ার কুনেইত্রায় ইসরাইলি ট্যাংকের অনুপ্রবেশ, বাড়ি বাড়ি তল্লাশি | ২০২৬
ছবির ক্যাপশন: সিরিয়ার কুনেইত্রায় ইসরাইলি ট্যাংকের অনুপ্রবেশ

সিরিয়ার কুনেইত্রায় ইসরাইলি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানের আকস্মিক অনুপ্রবেশ, বাড়ি বাড়ি তল্লাশি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় কুনেইত্রা প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সাঁজোয়া যান ও ট্যাংক আকস্মিক অনুপ্রবেশ করে তল্লাশি অভিযান চালিয়েছে। অধিকৃত গোলান মালভূমি সংলগ্ন সিরিয়ার এই কৌশলগত সীমান্ত অঞ্চলে ইসরাইলি বাহিনীর এমন গতিবিধি স্থানীয় পর্যায়ে নতুন করে তীব্র উত্তেজনা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘সানা’ এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

দুটি পৃথক এলাকায় ইসরাইলি বাহিনীর অভিযান

সিরিয়ার সরকারি সূত্র এবং স্থানীয় গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, এই অনুপ্রবেশের ঘটনাটি ঘটেছে মূলত দুটি পৃথক এলাকায়:

  • সাইদা আল-হানউত গ্রামে হানা: প্রথম ঘটনায়, ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর চারটি বিশেষ সামরিক যান কুনেইত্রার দক্ষিণাঞ্চলীয় গ্রামীণ এলাকার সাইদা আল-হানউত গ্রামে সরাসরি প্রবেশ করে। গ্রামে প্রবেশের পরপরই ইসরাইলি সেনাসদস্যরা বেশ কয়েকটি আবাসিক বাড়ি ঘেরাও করে এবং ভেতরে ঢুকে তল্লাশি অভিযান চালায়। তবে আকস্মিক এই অভিযানে কোনো নাগরিককে গ্রেপ্তার বা আটক করার খবর পাওয়া যায়নি।

  • আল-মুয়াল্লাকা গ্রামে ট্যাংক মহড়া: এর কিছু সময় পরই কাছাকাছি আরেকটি এলাকায় দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে। কুনেইত্রার দক্ষিণাঞ্চলের আল-মুয়াল্লাকা গ্রামের উপকণ্ঠে অবস্থিত তেল আল-দ্রেইয়াত এলাকার দিকে ইসরাইলের তিনটি শক্তিশালী ট্যাংক অগ্রসর হতে দেখা যায়। ট্যাংকগুলো ওই এলাকার সীমান্ত রেখা অতিক্রম করে বেশ কিছু সময় অবস্থান নেয়। তবে কোনো ধরনের বড় সংঘাত বা গোলাগুলির ঘটনা ছাড়াই পরবর্তী সময়ে ট্যাংকগুলো পুনরায় নিজেদের পূর্বের অবস্থানে পিছু হটে যায়।

কী উদ্দেশ্যে এই তল্লাশি চালানো হয়েছে, সে বিষয়ে ইসরাইলি বাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এই ঘটনাকে দেশের ‘সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।


গোলান মালভূমি ও সিরিয়া-ইসরাইল সীমান্ত সংঘাত: ১৯০০ থেকে ২০২৬

কুনেইত্রা প্রদেশে ইসরাইলি বাহিনীর এই আকস্মিক অনুপ্রবেশ ও সামরিক তৎপরতা ১৯০০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সীমানা নির্ধারণ এবং গোলান মালভূমিকে কেন্দ্র করে চলমান ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ।

  • বিংশ শতাব্দীর শুরু ও অটোমান জমানা (১৯০০-১৯৪৭): ১৯০০ সালের দিকে বর্তমান সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিন অঞ্চলটি অটোমান (উসমানীয়) সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯০০ সালের সেই শান্ত অবয়বটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফরাসি ও ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে খণ্ডিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে সিরিয়ার আত্মপ্রকাশ ঘটে এবং ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই সীমান্ত অঞ্চলটি স্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়।

  • ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ ও কুনেইত্রার পতন: ১৯৬৭ সালের জুন মাসে সংঘটিত ঐতিহাসিক ‘ছয় দিনের যুদ্ধে’ (Six-Day War) ইসরাইল সিরিয়ার কাছ থেকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গোলান মালভূমি এবং কুনেইত্রা প্রদেশ দখল করে নেয়। ১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপুর যুদ্ধের পর ১৯৭৪ সালের চুক্তি অনুযায়ী কুনেইত্রা শহরটি সিরিয়ার কাছে ফেরত দেওয়া হলেও এর চারপাশে একটি জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রিত বাফার জোন (UNDOF) তৈরি করা হয়। ১৯০০ সালের প্রথাবদ্ধ আঞ্চলিক সীমান্ত ব্যবস্থা ১৯৬৭ সালের পর সম্পূর্ণ পাল্টে যায়।

  • সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ ও ২০২৪-এর আঞ্চলিক সমীকরণ: ২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কুনেইত্রা অঞ্চলটি বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর ঘাঁটিতে পরিণত হয়। ফলে ইসরাইল এই সীমান্তকে তাদের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করে। ২০২৪ সালের পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইসরাইল বনাম ইরান-সমর্থিত অক্ষের (Axis of Resistance) লড়াই তীব্র রূপ ধারণ করায় সিরিয়ার মাটিতে ইসরাইলি বিমান হামলা ও স্থল অভিযান নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

  • ২০২৬-এর বর্তমান বাস্তবতা: ১৯০০ সালের সেই ঘোড়সওয়ার আর সাধারণ বাঙ্কার লাইনের আমল থেকে ২০ Anglican২৬ সালের এই আধুনিক থার্মাল ইমেজিং, ড্রোন নজরদারি এবং শক্তিশালী মারকাভা ট্যাংকের যুগে পৌঁছেও গোলান সীমান্তের উত্তেজনা প্রশমিত হয়নি। ২০২৬ সালের মে মাসের এই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইসরাইলের এই স্থল অনুপ্রবেশ প্রমাণ করে যে, তারা বাফার জোনের তোয়াক্কা না করে যেকোনো সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সিরিয়ার অভ্যন্তরে সরাসরি ‘সার্জিক্যাল’ অপারেশন চালাতে দ্বিধা করছে না।

বিশ্লেষণ ও উপসংহার

ইতিহাস সাক্ষী, গোলান মালভূমি যার নিয়ন্ত্রণে থাকে, দামেস্ক ও উত্তর ইসরাইলের ওপর সামরিক আধিপত্য তারই বজায় থাকে। ১৯০০ সালের সেই শান্ত সীমান্ত থেকে ২০২৬ সালের এই ট্যাংকের গর্জন—ইতিহাসের চাকা রক্তক্ষয়ী পথেই হেঁটেছে। বিশ্লেষকদের মতে, কুনেইত্রায় ইসরাইলি বাহিনীর এই আকস্মিক প্রবেশ কোনো নিয়মিত নজরদারি নয়, বরং সীমান্ত সংলগ্ন গ্রামে হিজবুল্লাহ বা কোনো প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সম্ভাব্য উপস্থিতি নস্যাৎ করার একটি আগাম প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ। ২০২৬ সালের এই মে মাসে গাজা ও মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক যুদ্ধাবস্থার মাঝে সিরিয়ার সার্বভৌমত্বে এই আঘাত নতুন কোনো আঞ্চলিক সংঘাতের স্ফুলিঙ্গ তৈরি করে কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।


সূত্র: ১. সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘সানা’ (SANA) এবং কুনেইত্রা সীমান্ত থেকে প্রাপ্ত স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন (১৬ মে, ২০২৬)। ২. ঐতিহাসিক দলিল: বিংশ শতাব্দীতে আরব-ইসরাইল যুদ্ধসমূহ এবং গোলান মালভূমির ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাস (১৯০০-২০২৬)।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুনবাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency